Tuesday , October 23 2018

লাউড় দুর্গে খনন শুরু

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ঐতিহাসিক স্থান লাউড়ের গড়। এই অঞ্চলেই ছিল প্রাচীন লাউড় রাজ্যের রাজধানী। স্বাধীন রাজ্য ছিল লাউড়। এখানে নির্মিত হয়েছিল দুর্গ। লাউড় রাজ্যের রাজধানীর এ দুর্গ খননের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। দুর্গ খননের আগে গত মঙ্গল ও বুধবার জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ৪ গবেষক। জরিপ শেষে গবেষকরা জানিয়েছেন, তাহিরপুরের লাউড়ে অনেক প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন পাওয়া গেছে।







বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সাদিক সুনামগঞ্জের ধারারগাঁওয়ের বাসিন্দা। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যানসহ সংশ্নিষ্টদের এ দুর্গের বিষয়ে অবহিত করেছিলেন তিনি। ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিচারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি চিঠিও দিয়েছিলেন।







ইতিহাস পর্যালোচনা করে চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, প্রাচীনকাল থেকে শ্রীহট্ট (সিলেট) কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। শ্রীহট্টের তিন ভাগ তিনজন পৃথক নৃপতি দ্বারা শাসিত হতো। গৌড়, লাউড় ও জয়ন্তিয়া- এই তিন খণ্ডের নৃপতির অধীন ছিলেন আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূমি মালিক। লাউড় রাজ্য ছিল সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ জেলার কিয়দংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। লাউড় ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য। তাহিরপুরের সীমান্ত এলাকায় লাউড়ের রাজধানী ছিল। এ রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ হলহলিয়া গ্রামে এখনও বিদ্যমান। এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কেশব মিশ্র। তারা ছিলেন কাত্যান গোত্রীয় মিশ্র। তাদের উপাধি ছিল সিংহ। খ্রিষ্টীয় দশম অথবা একাদশ শতকে তিনি কনৌজ থেকে এখানে আসেন। লাউড় রাজ্যের রাজধানী লাউড় ছাড়াও জগন্নাথপুর ও বানিয়াচংয়ে আর দুটি উপ-রাজধানী ছিল।







ইতিহাসবিদ ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের মতে, সম্ভবত ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে লাউড় রাজ্য স্বাধীনতা হারায় এবং মোগলরা এর নিয়ন্ত্রক হয়। লেখক সৈয়দ মূর্তজা আলী তার রচিত ‘হযরত শাহ্‌জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি.) লাউড়ের রাজা গোবিন্দ সিংহ তার জ্ঞাতিভ্রাতা জগন্নাথপুরের রাজা বিজয় সিংহের সঙ্গে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিরোধে লিপ্ত হয়েছিলেন। এর জের ধরেই বিজয় সিংহ গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন। বিজয় সিংহের বংশধররা এ হত্যার জন্য গোবিন্দ সিংহকে দায়ী করে তার বিরুদ্ধে মোগল সম্রাট আকবরের রাজদরবারে বিচারপ্রার্থনা করেন। এ ঘটনার বিচারের জন্য সম্রাট আকবর দিল্লি থেকে সৈন্য পাঠিয়ে গোবিন্দ সিংহকে দিল্লিতে ডেকে নেন। বিচারে তার ফাঁসির হুকুম হয়। পরে গোবিন্দ সিংহ সম্রাট আকবরের কাছে প্রাণভিক্ষা চান ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। গোবিন্দ সিংহের নাম হয় হাবিব খাঁ। সম্রাট আকবর গোবিন্দ সিংহকে তার হূতরাজ্য পুনরায় দান করেন।







প্রাচীন নানা গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, হাবিব খাঁর পৌত্র ছিলেন মজলিস আলম খাঁ। মজলিস আলম খাঁর পুত্র ছিলেন আনোয়ার খাঁ। তিনি খাসিয়াদের উৎপাতের কারণে সপরিবারে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের লাউড় ছেড়ে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে চলে যান এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। এই বংশেরই উমেদ রাজা লাউড়ে একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এই দুর্গের ধ্বংসাবশেষই লাউড়ের হাউলী বা হাবেলী নামে পরিচিত। বর্তমানে এই দুর্গের ভগ্নাবশেষ দেখা যায়। প্রতিটি প্রকোষ্ঠের কারুকার্য দেখলে যে কেউ মনে করবেন এখানে সল্ফ্ভ্রান্ত কোনো রাজা বা নৃপতি বাস করতেন।







মঙ্গল ও বুধবার লাউড়ের গড়ের ঐতিহাসিক এ স্থান পরিদর্শন করেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আতাউর রহমানের নেতৃত্বে ৪ প্রত্নতত্ত্ববিদ। তারা দুই দিন সরেজমিনে ঘুরে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এ প্রতিবেদককে জানান, তারা নিশ্চিত এখানে প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন পাওয়া যাবে। মহাভারত, রামায়ণ, পাল, সেন, হযরত শাহজালাল (র.), সুলতানি আমল, মোগল এবং শ্রী চৈতন্যের প্রভাব রয়েছে এ এলাকায়। এ অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে তারা যুক্ত হয়ে আছেন। ২০০ বছর এ ঐতিহ্যের খোঁজ-খবর নেওয়া হয়নি। খনন কাজ শুরুর আগে যাচাইয়ের অংশ হিসেবে এ জরিপ কার্যক্রম করলেন বলে জানান তারা।







ড. আতাউর রহমানের মতে, বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল যেমন বরেন্দ্র অঞ্চল, গৌড় অঞ্চল, দক্ষিণবঙ্গের ষাটগম্ভুজ বা বারোবাজারে যেভাবে গবেষণা হয়েছে সেই তুলনায় সিলেট অঞ্চলে গবেষণা হয়নি। এখন কিছু কাজ শুরু হয়েছে এবং লাউড়ের গড়ে বিস্ময়কর তথ্যভাণ্ডারের খোঁজ পাওয়া গেছে।







তিনি জানান, বৃহস্পতিবার তাহিরপুরে আসা অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানকেও তিনি তাদের জরিপ কার্যক্রমে প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন পাওয়া নানা তথ্য জানান।







প্রতিমন্ত্রী তাদের উৎসাহিত করে বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের নিকটতম স্থানে এমন প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন আবিস্কার হলে এটি পর্যটন বিকাশে ভূমিকা রাখবে।