Thursday , November 15 2018

ই-কেনাকাটা কঠিন নয়

দেশে ই-কমার্সে কেনাকাটা বাড়ছে। সে তুলনায় বাড়েনি গ্রাহক সচেতনতা। এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, ৫৯ শতাংশেরই পদ্ধতিটি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। অনলাইনে পণ্য কেনার পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তুহিন মাহমুদ







কাঙ্ক্ষিত পণ্যের খোঁজ

অনলাইনে পণ্য কেনার প্রথম ধাপ হচ্ছে নির্দিষ্ট সাইটের ঠিকানা জানা বা সঠিক সাইট খুঁজে বের করা। কারণ সব ই-কমার্স সাইটে সব ধরনের পণ্য থাকে না। পণ্য উৎপাদনকারী অনেক প্রতিষ্ঠানও নিজেদের সাইটের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে। নির্দিষ্ট সাইটের ঠিকানা না জানা থাকলে গুগলে সার্চ করুন। সার্চ করার সময় পণ্যটির নামের সঙ্গে ইংরেজিতে বিডি কিংবা বাংলাদেশ লিখলে প্রধানত বাংলাদেশি সাইটগুলো আসবে।







অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিচিত ও জনপ্রিয় ই-কমার্স ওয়েবসাইটগুলো থেকে পণ্য কেনার চেষ্টা করবেন। এসব সাইটে পণ্য সম্পর্কে বিবরণসহ বিস্তারিত তথ্য দেওয়া থাকে। পণ্যের রিভিউ, পণ্য ও বিক্রেতার রেটিং, রিফান্ড পলিসি ও কোনো অফার আছে কি না সেগুলো পড়ে নিতে পারেন। সব কিছু ঠিকঠাক মনে হলে সেখানে থাকা ‘অ্যাড টু কার্ট’ অথবা ‘বাই নাও’ বাটনে ক্লিক করুন। এভাবে এক বা একাধিক পণ্য কার্টে যুক্ত করতে পারবেন।







নিবন্ধন বা লগইন

পণ্য কার্টে যুক্ত করার পর সেটি অর্ডার করার পালা। এ ক্ষেত্রে ক্রেতাকে সাইটটিতে নিবন্ধন করতে হবে। আগে নিবন্ধন করা থাকলে লগইন করতে হবে। মূলত ক্রেতার তথ্য ও পণ্য পৌঁছানোর ঠিকানা জানার জন্যই এই নিবন্ধন করা হয়ে থাকে। নিবন্ধনের সময় নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, বসবাসের ঠিকানা ও পণ্য ডেলিভারির ঠিকানা দিতে হয়। নিবন্ধন করা থাকলে পরবর্তী সময়ে তাড়াতাড়ি পণ্য অর্ডার করা যায়। নিবন্ধনে সাধারণত দুই মিনিটেরও কম সময় লাগে।







হাতে পণ্য

লগইন হয়ে গেলে ক্রেতা কোন ঠিকানায় পণ্য ডেলিভারি নিতে চান, তা নির্বাচন করে দিতে হবে। অন্য ঠিকানায় চাইলে সেটি লিখে দিতে হবে। কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান তাদের অফিস থেকেও পণ্য গ্রহণের সুবিধা দেয়। এ ক্ষেত্রে বিশেষ অফারও থাকে। যেমন—আজকেরডিলের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পণ্য কিনলে ঢাকায় বিনা মূল্যে ডেলিভারি দেওয়া হয়। বাগডুমডটকম থেকে ঢাকায় ও তাদের অফিস থেকে পণ্য ডেলিভারি নিলে গ্রাহককে কোনো ডেলিভারি চার্জ দিতে হয় না।







ডেলিভারি সময়

ঢাকায় পণ্যভেদে সাধারণত দুদিন থেকে এক সপ্তাহ এবং ঢাকার বাইরে চার দিন থেকে ১৫ দিন সময় নিয়ে পণ্য পৌঁছানো হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডেলিভারির সুবিধা রয়েছে। এক্সপ্রেস ডেলিভারি নামের এই সেবা পেতে বাড়তি খরচ গুনতে হয়। আর দেশের বাইরের কোনো ওয়েবসাইট থেকে পণ্য কিনলে এক সপ্তাহ থেকে দুই মাস কিংবা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।







দাম শোধ

পণ্য নির্বাচন ও ডেলিভারির তথ্য প্রদান শেষে এবার মূল্য পরিশোধের ধাপ। এই ধাপে আপনি অনলাইন ইনভয়েস দেখতে পাবেন। আপনার পণ্যের দাম, ডেলিভারি চার্জ সব কিছু মিলে আপনাকে পণ্যটি গ্রহণ করার জন্য মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে তা দেখা যাবে।







দেশের বেশির ভাগ ই-কমার্স ওয়েবসাইটের ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধা রয়েছে। এই পদ্ধতিতে আপনি পণ্য হাতে পেয়ে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। কিছু কিছু ওয়েবসাইট কার্ড অন ডেলিভারি সুবিধাও দিচ্ছে। এতে পণ্য হাতে পাওয়ার পর সরবরাহকারীর কাছে থাকা পিওএস মেশিনে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দাম পরিশোধ করতে পারেন।







ক্রেডিট অথবা ডেবিট কার্ড দিয়ে অনলাইনে মূল্য পরিশোধের সুবিধা বেশির ভাগ ই-কমার্স সাইটেরই আছে। বাংলাদেশে সাধারণত মাস্টার কার্ড, ভিসা, নেক্সাস, আমেরিকান এক্সপ্রেস, অ্যামেক্স সুবিধাযুক্ত ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড বেশি চলে। অনলাইনে কেনাকাটার জন্য ব্যাংকে ফোন করে কার্ডটি চালু করে নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য আপনি ‘পেমেন্ট লিমিট’ অর্থাৎ একবারে সর্বোচ্চ কত টাকা পরিশোধ করতে পারেন তা ব্যাংককে নির্ধারণ করে দেওয়ার নির্দেশনা দিতে পারবেন। অনলাইনে পেমেন্ট করার জন্য কার্ডের মালিকের নাম, কার্ডের নম্বর, মেয়াদ, পেছনে থাকা তিন অথবা চার সংখ্যার কার্ড ভেরিফিকেশন কোড (সিভিসি) নম্বরটি প্রবেশ করাতে হয়। এসব তথ্য দেওয়ার পর পরবর্তী ধাপে টু স্টেপ ভেরিফিকেশন সুবিধা থাকলে মোবাইলে আসা ভেরিফিকেশন কোডটি প্রবেশ করাতে হবে। আর যদি টু স্টেপ ভেরিফিকেশন না থাকে, তাহলে সব তথ্য ঠিক থাকলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পেমেন্ট সফল হওয়ার বার্তা দেখতে পাবেন।







কিছু সাইটে কার্ডের পাশাপাশি অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে।







কার্ড বা ব্যাংক ছাড়াও কিছু সাইট পেইজা, পেপ্যাল, আইপে ইত্যাদির মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেয়।







ক্যাশ অন ডেলিভারির পর বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় পেমেন্ট পদ্ধতি হলো মোবাইল ওয়ালেট। বিকাশ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমেও মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে। ওয়েবসাইট থেকে এ ধরনের সেবা নির্বাচন করলে তারা কোন নম্বরে পেমেন্ট করতে হবে এবং কিভাবে করতে হবে সেটি জানিয়ে দেওয়া হয়। তাদের দেখানো পদ্ধতিতে মূল্য পরিশোধ করার পর ওয়েবসাইটের নির্দিষ্ট বক্সে ট্রানজেকশন আইডি দিতে হবে। ট্রানজেকশন আইডি ঠিক থাকলে সফলভাবে মূল্য পরিশোধের তথ্য দেখাবে।







অনলাইনে কোনো অর্ডার করলে কিংবা পেমেন্ট করার পর আপনার মোবাইলে এসএমএস কিংবা ই-মেইলের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের কল সেন্টার থেকে কল করে অর্ডারটি সম্পর্কে নিশ্চিত করা হয়।







পণ্য ফেরত দিতে চাইলে

প্রায় বেশির ভাগ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব রিফান্ড ও রিটার্ন পলিসি রয়েছে। বর্তমানে পণ্য ডেলিভারির সময় যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পছন্দ না হলে কিংবা কোনো সমস্যা থাকলে সরাসরি ডেলিভারিম্যানকে ফেরত দেওয়া যায়। পণ্য গ্রহণ করার পরও ফেরত দেওয়ার সুবিধা দেয় কিছু কিছু সাইট। তবে সে ক্ষেত্রে ক্রেতাকে নিজের খরচে পণ্যটি ফেরত দিতে হয়।

তবে পণ্য কেনার আগে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির রিফান্ড ও রিটার্ন পলিসি পড়ে নেওয়া উচিত।







অ্যাপে কেনাকাটায় বাড়তি সুবিধা

বর্তমানে জনপ্রিয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগেরই নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ রয়েছে, যার মাধ্যমে পণ্য কেনাকাটা করা যায়। গুগল প্লেস্টোর, আইওএস স্টোর থেকে এসব অ্যাপ (যদি থাকে) ডাউনলোড করা যায়। অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কেনাকাটার পদ্ধতি প্রায় একই। অ্যাপে সাধারণত প্রথম দিকেই লগইন করতে হয়। তাই বারবার নাম, ঠিকানা ইত্যাদি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এ ছাড়া অ্যাপের ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অফার, ছাড় ইত্যাদি দেওয়া হয়ে থাকে।







এফ-কমার্স থেকে কেনাকাটা

এফ-কমার্স বা ফেইসবুক কমার্সও বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। এ পদ্ধতিতে বিক্রেতারা তাদের পণ্য ফেইসবুক পেইজ, গ্রুপ বা আইডির মাধ্যমে প্রচার করে থাকেন। সেখানে পণ্যের বিবরণ দেওয়া হয়। সেখান থেকে পণ্য পছন্দ হলে পেইজে থাকা নম্বরে কল করে, কমেন্টের মাধ্যমে অথবা মেসেজের মাধ্যমে পণ্যটি অর্ডার দিতে পারেন।







কল করেই কেনাকাটা

অ্যাপ ডাউনলোড, নিবন্ধন করে লগইন, কার্ডের তথ্য দেওয়া—এগুলো ভোগান্তি মনে হলে সরাসরি ফোন করেও পণ্য অর্ডার করতে পারেন। সাইটে দেওয়া কলসেন্টার নম্বরে ফোন করে কিনতে চাওয়া পণ্যটির বিস্তারিত ও পৌঁছানোর ঠিকানা জানান। আপনার ঠিকানায় পণ্য পৌঁছানোর পর দাম পরিশোধ করুন।







সচেতনতা জরুরি

যথাযথ পণ্য সরবরাহ না করা, নকল পণ্য সরবরাহ করা এবং টাকা নিয়ে পণ্য না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কিছু ওয়েবসাইট ও এফ-কমার্সের বিরুদ্ধে। তাই পণ্য কেনার আগে রিভিউ দেখে, প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে, টার্মস ও পলিসি পড়ে পণ্য কেনা উচিত।







পণ্য কিনে হয়রানির শিকার হলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে।