Wednesday , November 14 2018

যে কারণে রোডমার্চ বাতিল করেছে ঐক্যফ্রন্ট

যে কারণে রোডমার্চ বাতিল- রাজশাহীর অভিমুখে রোডমার্চ বাতিল ঘোষণা করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বরাত দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং সদস্য শায়রুল কবীর খান এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, বিকেলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে মির্জা ফখরুল ইসলামের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ঐক্যফ্রন্টের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি।

শায়রুল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হচ্ছেন এ কারণে রোডমার্চ বাতিল করা হয়েছে।

তবে রাজশাহীতে সমাবেশ হবে বলে জানান তিনি।







এর আগে মঙ্গলবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৮ নভেম্বর রাজশাহীর উদ্দেশে রোডমার্চ এবং ৯ নভেম্বর সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

এর আগে গণভবনে সংলাপের পরে বিকালে বেইলি রোডে ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন আমরা বৃহস্পতিবার রোডমার্চ করে রাজশাহী যাব। শুক্রবার সেখানে জনসভা করব। কয়েকঘণ্টা পরেই তারা আবার কর্মসূচি পরিবর্তন করলেন।

বেলা সাড়ে ১১ টায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে অংশ নেন ড. কামাল হোসেনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১১ জন নেতা। সংলাপ শেষে বেলা ৩টায় তিনি বেইলী রোডের বাসায় ফেরেন। এরপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা রূদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এরপর সংলাপের বিষয়ে কথা বলতে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহম্মেদ প্রমূখ এসময় উপস্থিত ছিলেন।

সংলাপ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমরা জনগণের দাবি নিয়ে গিয়েছিলাম। সংলাপ যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে চেষ্টা করব। সরকার যদি আমাদের দাবি না মেনে, আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) তফসিল ঘোষণা করে- তাহলে আমরা আগেই আমাদের কর্মসূচি ঘোষণা করে রেখেছি। আমরা আন্দোলনে আছি’।

তিনি বলেন, আগামীকাল রাজশাহীতে রোডমার্চ হবে। পরদিন সেখানে সমাবেশ হবে। সংলাপ আমাদের আন্দোলনেরই অংশ। যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত। সরকার যদি তা না চায়, তার দায়ভার তাদের। আমরা আমাদের দাবিগুলো নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছি।







তফসিলের সঙ্গে আলোচনার কোনো সম্পর্ক নেই দাবি করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন প্রয়োজনে তফসিল পেছানো হতে পারে।

তিনি বলেন, অর্থবহ নির্বাচনই আমাদের দাবি। এই দাবি নিয়েই আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসেছি। এখন এই দাবি যদি সফল না হয়, কোনো সমাধান না আসে তাহলে সেই দায় সরকারেরই।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আলোচনা হয়েছে, তবে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা বলেছি, তিনি আইনগতভাবেই জামিন পাওয়ার যোগ্য।

প্রথম দফা সংলাপে সন্তুষ্ট হতে পারেননি, এবার সন্তুষ্ট হয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনগণ আশার আলো দেখলেই সংলাপ সফল হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই দাবি আদায় করা হবে।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথমদফায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে কোনো সমাধান না হওয়ায় বুধবার দ্বিতীয়দফায় সংলাপে বসেন নেতারা। সংলাপে ১৪-দলীয় জোটের প্রতিনিধিদলে ছিলেন ১১ জন। তারা হলেন- আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ সেলিম, মতিয়া চৌধুরী, ওবায়দুল কাদের, অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, শ ম রেজাউল করিম, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেনন।







তাদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১১ সদস্য প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ড. কামাল হোসেন।

প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদ, জাসদের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও এসএম আকরাম এবং সুলতান মোহাম্মদ মনসুর।

আসলে কি হতে যাচ্ছে?

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের দুই দফা সংলাপ জাতিকে অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য সরকারের কাছে তুলে ধরা ৭ দফার প্রধান দাবিগুলোই নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

নির্বাচনের আগে বর্তমান সংসদ ভেঙ্গে দেওয়া, দলীয় সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচনকালী নির্দলীয় সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির নিশ্চয়তা পায়নি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। রাজনৈতিক মতবিভেদ জিইয়ে রেখেই বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণাকে সমর্থন করেছে আওয়ামী লীগ।

বুধবার (৭ নভেম্বর) গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দ্বিতীয় দফা সংলাপ শেষে বিকেলে বেইলি রোডে সংবাদ সম্মেলন করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।







সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা সংলাপের মাধ্যমে দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছি। আমরা চেয়েছি শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি আদায় করতে। এখন বল প্রধানমন্ত্রীর কোর্টে। এরপর যা হবে তার দায়-দায়িত্ব সরকারের।

তিনি বলেন, সারা দেশে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা প্রত্যাহার ও ভবিষ্যতে আর মামলা দায়ের না করা এবং নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার না করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু অন্য বিষয়গুলো অমিমাংশিত রয়েছে গেছে। আমরা চাই একটা স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে সবকিছু হোক।

সংবাদ সম্মেলনে সংলাপ সফল না হওয়ার দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে জানিয়ে দেন ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করা হবে। আমরা আন্দোলনে আছি। কাল রাজশাহীতে সমাবেশ হবে। সংলাপ আমাদের আন্দোলনেরই অংশ।

যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত। সরকার যদি তা না চায়, তার দায়ভার তাদের। আমরা আমাদের দাবিগুলো নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছি। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে, তাদের সঙ্গে নিয়েই আন্দোলন মাধ্যমে দাবি আদায় করবো।







নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে-এ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, তফসিলের সঙ্গে আলোচনার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। প্রয়োজনে তফসিল আবার পরেও ঘোষণা করা যাবে। ওটাকে রিসিডিউল করা যেতে পারে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আলোচনা মনঃপূত হয়নি, দ্বিতীয় দফা সংলাপেও কোনো ‘সমাধান’ পাইনি।

ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের সংলাপ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে ।

তবে চাইলে এর পরও ছোট পরিসরে সরকার দলীয়দের সঙ্গে বিরোধী দল ও জোটের আলোচনা চলতে পারে। সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে একজন প্রধান উপদেষ্টার অধীনে ১০ জন উপদেষ্টামণ্ডলীর সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের পুরনো ফর্মুলা তুলে ধরা হয়। এই দাবিগুলো ‘সংবিধানসম্মত নয়’ বলে সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের জানান ওবায়দুল কাদের।

বিরোধীদের বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে ৯০দিন পর নির্বাচনের দাবি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন পরে নির্বাচনের দাবির ক্ষেত্রে কোনো দূরভিসন্ধি বা কৌশল থাকতে পারে। এখানে তৃতীয় কোনো শক্তির ক্ষমতায় আসার সুযোগ থাকে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় সব পক্ষকে সমান সুযোগ দেয়া, রাজনৈতিক মামলার সুরাহা করাসহ সংবিধান সম্মত যেসব বিষয়ের দাবি তারা করেছে সেগুলোর বিষয়ে সরকার ব্যবস্থা নেবে।







এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা পূর্বঘোষিত বৃহস্পতিবারই তফসিল ঘোষণায় অনঢ় রয়েছেন। তার এই তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। বুধবার নির্বাচন ভবনে গিয়ে সিইসিসহ নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের অবস্থান জানায় আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল। ১৬ সদস্যের এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এইচ টি ইমাম।

বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭ টায় সিইসি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। ওই ভাষণেই তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন। এ ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করবে বিটিভি ও বেতার।

এর আগেই গণভবনে অনুষ্ঠিত হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আয়োজিত সংলাপের ফলাফল নিয়ে কথা বলতে বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণভবনে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা তাদের করণীয় নিয়ে দফায় দফার মিটিং করছেন। এরই মধ্যে ঢাকা থেকে রাজশাহী অভিমুখে পূর্বনির্ধারিত রোডমার্চ কর্মসূচি তারা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে রোডমার্চ বাতিল করলেও রাজশাহীতে জনসভা করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

সূত্র: পূর্বপশ্চিমবিডি