ইতিহাসে অবহেলিত আসল বঙ্গবীর, মৃত্যুবার্ষিকী ছিল আজ

বাঙালি জাতি সত্তার অভ্যুদয়ে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল পৃথিবীর সামরিক যুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য উদাহরণ। এক বিরল দৃষ্টান্ত। সাধারণ জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত একজন গণপরিষদ সদস্য ও একজন সফল সামরিক অধিনায়কের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল, পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম সফল গণযুদ্ধ, বিশ্বের বিস্ময়—যে যুদ্ধের সিপাহসালার ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ নির্বাচনী এলাকা (সিলেটের গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথ) থেকে ৯৯ ভাগ ভোটে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য বঙ্গবীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী। রাম ছাড়া যেমন রামায়ণ হয় না, ডেনমার্কের যুবরাজ ছাড়া যেমন হেমলেট রচনা করার কথা চিন্তাও করা যায় না—তেমনি বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা করা যায় না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনও অনুষ্ঠানে তার নাম নেওয়া হয় না। পাঠ্যপুস্তকে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের বীরত্ব ও জীবনগাথা অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। রাষ্ট্রীয়ভাবে ওসমানীর জন্ম-মৃত্যু দিবস কখনো পালিত হয় না। তিনি আজ অবহেলিত-উপেক্ষিত। এমনকি তিনি আজ ইতিহাস বিস্মৃতির করাল গ্রাসে নিপতিত। মুক্তিযুদ্ধের সমরনায়ক হয়েও তার নামের সঙ্গে যুক্ত করা হয় না বীরউত্তম, বীরবিক্রম কিংবা বীরপ্রতীক উপাধি। হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তার নামের আগে প্রধান সেনাপতি (কেবল সেনাবাহিনীর প্রধান) লেখা হয়? জনগণের দেওয়া তার বঙ্গবীর খেতাবটিও আজ ছিনতাই হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস বারবার কলঙ্কিত করে জনক আর ঘোষকের হত্যাকারীরা। যখন রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হয়ে ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়ে মিথ্যা ইতিহাস রচনার সুযোগ পায়! হিংসা-বিদ্বেষ আর পরস্পরের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দিয়ে দেশ-জাতি-সমাজ-সভ্যতা আর ইতিহাসকে যখন ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তখন কঠিন-কঠোর সত্য অন্বেষণে আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে জেগে ওঠা বড় বেশি প্রয়োজন।

১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজধানীর মিরপুরে এক বাসায় সাক্ষাৎ হয় ওসমানীর। আগে থেকেই তারা একে অন্যকে জানতেন। একজন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন উৎসর্গ করে কাজ করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ওসমানী তাঁর পরিচয় পর্বের কথা তুলে ধরেছেন এভাবে—‘আমার প্রিয় বঙ্গবন্ধু, অনুগ্রহ করে স্মরণ করবেন যে উপমহাদেশের রাজনীতি চর্চায় কপটতার প্রকোপ…প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকার কারণেই ১৯৭০ সালে আমি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ঘোরতর অনিচ্ছুক ছিলাম। জাতীয় চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বার্থে আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তার ওপর আপনি জোর দিয়েছিলেন।…বাঙালিদের স্বার্থ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে আপনি কখনো আপস করেননি। তাই আপনি ও আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্র, সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশরক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করবেন এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার পরই আমি রাজনীতিতে যোগ দিই।’ (সূত্র: ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে লেখা পদত্যাগপত্র)।

বাংলাদেশের জন্মের পর সাংবিধানিকভাবে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান করা হয় রাষ্ট্রপতিকে। কিন্তু একাত্তরে আমাদের কোনো সংবিধান ছিল না, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ব্যতিক্রমী যুদ্ধ। যে কারণে ১৯৭১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভা কনভেনশনের আওতায় পাকিস্তানি বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। জেনারেল ওসমানী নিজের আত্মসম্মান রক্ষার্থে উপস্থিত হননি। একটি গেরিলা যুদ্ধের প্রধানের কাছে আত্মসমর্পণ না করে ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান বাহিনী। উপ-অধিনায়ক এ কে খন্দকার কেবল আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আর তাই কোনও গোপনীয়তা নয়, কোনও চল-চাতুরী বা ইতিহাসের বিকৃতি নয়। সময় এসেছে সঠিক-সত্য ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরার। সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা!

ইতিহাস লেখার যোগ্যতা কিংবা ধৃষ্টতা আমার নেই। তবে ইতিহাসের একজন নগণ্য ছাত্র ও একজন আইনজীবী হিসেবে সামান্য কিছু তথ্য দিয়েই আমার এ লেখার ইতি টানতে চাই। সময় ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল, এক সরকারি সার্কুলারে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে একজন কেবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বাংলাদেশের সব বাহিনীর অধিনায়ক ঘোষণা করা হয় ওসমানীকে। ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারি স্মারক নম্বর ৩৮৩০/এক/পিপি অ্যান্ড এ-২ মোতাবেক জেনারেল ওসমানী কমান্ডার ইন চিফ পদ থেকে অবসর ভাতা গ্রহণ করেন। (তথ্য: ১৯৮২ সালের ৪৯০ নম্বর সত্ত্ব মোকদ্দমার রায় ও বিচারপতি বিজন কুমার দাসের বঙ্গবীর ওসমানীর মামলা)।

অপ্রাসঙ্গিক নয় বিধায় উল্লেখ করতে চাই, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবীর ছিলেন আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পরস্পর সম্পূরক-পরস্পর পরিপূরক দুই জাতীয় বীর। ২৫ মার্চের কালো রাতে একজন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দী হলে অন্যজন নিজের জীবন বাজি রেখে মুজিবনগর সরকারের মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হয়ে যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেন, যে স্বাধীনতার মহান স্থপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে যুদ্ধে সরকার পরিচালনায় অসাধারণ নৈপুণ্য আর পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন মরহুম তাজউদ্দিন আহমেদ।

বঙ্গবীর ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রথম সংসদে, সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ বাঙালি জাতীয়তাবাদের রূপ রেখা তুলে ধরে যে বক্তব্য দেন (বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে) তাতে তিনি বলেন, ‘এ সংগ্রাম হলো প্রথম মুক্তিসংগ্রাম, যেখানে সাংবিধানিক উপায়ে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়।…এ যুদ্ধে সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছিল। এ যুদ্ধে আমার অপ্রাপ্য সম্মান ছিল বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর, মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করার!’ (সূত্র: মহান জাতীয় সংসদের ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবরের কার্যবিবরণী)।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বঙ্গবীর ওসমানী। (তথ্য: দৈনিক ইত্তেফাকসহ প্রকাশিত পত্রিকা, গবেষণা গ্রন্থ—স্বাধীনতা যুদ্ধের সিপাহসালার বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী, এমনকি অদ্যাবধি তার চরম শত্রু পাকিস্তানের কোনও দালাল কিংবা সিআইএও কোনও তথ্য দিতে পারেনি, তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত ছিলেন)।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নিশ্চিত পরাজয় জেনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম দিয়ে গেছেন। তার সবচেয়ে দুর্বলতম অংশ (যাদের তিনি সন্তানের চেয়েও ভালোবাসতেন) সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা যখন খুনোখুনি করে বিদেশিদের হাতে দেশের স্বাধীনতা তুলে দিতে উদ্যত হয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে দেশমাতৃকার অকুতোভয় এই দুঃসাহসী সন্তান একাত্তরের ন্যায় আবার গর্জে উঠে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছিলেন। ভীরু কাপুরুষের মত গর্তে ঢুকে বসে থাকেননি। অনেকের পরামর্শ উপেক্ষা করে কেবল বিবেকের তাড়নায় দুই মাস পর কয়েক দিনের জন্য খন্দকার মোশতাকের নড়বড়ে সরকারের অবৈতনিক সামরিক উপদেষ্টা হয়েছিলেন এবং জেল হত্যা রোধে ব্যর্থ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করে চলেও গিয়েছিলেন।

জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার সেই সময়ের ভূমিকার অবমূল্যায়ন না করে, তাঁর জীবিত ঘনিষ্ঠজনেরা আমাদের প্রজন্মের জন্য সেই সঠিক ইতিহাস একদিন লিখে যাবেন—এই আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

১৯৭২ সালে নৌ ও বিমানমন্ত্রী ওসমানীকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া বালুর মাঠে দেওয়া বিরাট সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম আলী আহমদ চুনকা ‘বঙ্গবীর’ খেতাবে ভূষিত করলে হাজার হাজার জনতা বিপুল করতালির মাধ্যমে ওসমানীকে বঙ্গবীর হিসেবে অভিষিক্ত করে নেয়। তারপর থেকেই সব মাধ্যমে তার নামের আগে ‘বঙ্গবীর’ শব্দটি ব্যবহৃত হতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি রণাঙ্গনের সাহসিকতার জন্য ‘বাঘা’ সিদ্দিকী নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি একদিন বঙ্গবীর হয়ে গেলেন!

বঙ্গবীর ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে নিজের সব সহায়-সম্পদ জনকল্যাণে দান করে গেছেন। চিরকুমার এই বীর তাঁর কোনো উত্তরাধিকারীও রেখে যাননি। তবে রেখে গেছেন ৫৫ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশ, বাংলাদেশ। রেখে গেছেন কোটি কোটি ভক্ত অনুরাগী-উত্তরাধিকার।