Sunday , April 21 2019

” পাবলিক ভার্সিটি তোমাকে জাস্ট একটা সার্টিফিকেট দেবে, আর কিছুই না ! “

পাবলিক ভার্সিটি তোমাকে জাস্ট একটা সার্টিফিকেট দেবে, আর কিছুই না!যারা ‘কোথাও’ চান্স পাওনিযারা জিততে পারনি, তাদেরকে বলছি : জিততে পারনি, ভাল কথা। কিন্তু তাই বলে হেরেও যেও না।আচ্ছা, জেতা কাকে বলে?আমি যখন চুয়েটে চান্স পেলাম, তখন টপ সাবজেক্ট ছিল কম্পিউটার সায়েন্স। ‘টপ সাবজেক্ট’ মানে, সেই সময়টাতে চলছিল সিএসই’র ক্রেজ। মানে, সিএসই’তে পড়াশোনা করলে ভাল চাকরি পাওয়া যাবে, সবাই এটা ভাবছিল। আমি অ্যাডমিশন টেস্টে ২য় হয়েছিলাম, মানে যারা চুয়েটে চান্স পায়নি, তাদের চোখে (হয়তোবা) ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার দৌড়ে আমি যোগ্যতমদের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে। আরও সহজ করে যদি সরলীকরণ করি, আমার হওয়ার কথা ছিল ২য় সেরা ইঞ্জিনিয়ার! এইতো? নাকি?কিন্তু দেখ, আমি আজকে কী করছি। কেন করছি?

আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম, সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করতে। জানো তো, যারা ভার্সিটিতে সাহিত্য নিয়ে পড়ে, ওদেরকে সবাই ভাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। আর বাবা-মা’রা চান না, উনাদের সন্তান দ্বিতীয় নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠুক। কেন উনারা ওরকম করে ভাবেন? এখনও অনেকে এই ধারণা নিয়ে বসে থাকেন, সাহিত্যে পড়লে পাস করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করা ছাড়া আর কী-ই বা করবে? আর মাস্টাররা তো গরীব, তাই ওরকম মাস্টার হয়ে কী হবে? তার মানে দাঁড়াল এই, আমাদের বাবা-মা’রা আমাদেরকে ‘কিছু একটা’ হিসেবে দেখতে চান। কথা হল, ওই ‘কিছু একটা’ আসলে কী? ওটা হল, আর্থিক সচ্ছলতা আর সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটা অবস্থান। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটা না পড়াশোনা করতে যাই, তার চাইতে ঢের বেশি যাই পাস করার পর একটা ভাল বেতনের চাকরি জোটাতে। আজকের দিনে Learning= L(Earning)= Love Earning!মানে, পড়াশোনার উদ্দেশ্য, জ্ঞানার্জন নয়, সম্মানজনকভাবে অর্থোপার্জন। এখন আসি, যারা যেখানে চান্সপেতে চাইছিলে, সেখানে পাওনি, তাদের ক্ষেত্রে এই উদ্দেশ্যটা কতটা সফল হবে?

কিছুটা আত্মকথনের মধ্যদিয়ে আমি এর উত্তরটা দেয়ার চেষ্টা করছি।আমি যখন ইন্টারে চট্টগ্রাম কলেজে পড়তাম, তখন সহজসরল বোকাসোকা পড়ুয়া স্টুডেন্ট হিসেবে আমার সুনামছিল। আচ্ছা, পড়ুয়া…… তো, কী পড়তাম? যা পড়তে ভাল লাগত। কী পড়তে ভাল লাগত? অবশ্যই ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি-ম্যাথস এসব নয়। এর আগে স্কুলে পড়ার সময় শুনতাম, যারা ভাল স্টুডেন্ট তাদের ম্যাথস ভাললাগা উচিত। মজার না? আমরা এমন একটা সমাজে বড় হই, যেখানে কী ভাললাগা উচিত, এটাও ঠিক করে দেয়া হয়। 3 Idiots মুভির মতো জন্মের পরপরই ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার সিল মেরে দেয়া হয়! ‘ভাললাগাউচিত’ বলে কিছু থাকাই তো উচিত নয়, তাই না? এই যেমন ধর, ‘রবীন্দ্রনাথকে ভাললাগা উচিত’ বলে কিছু নেই; এমনকি রবীন্দ্রনাথকে ভাললাগানোটা যদি ফ্যাশনও হয়, তবুও। সবাইকেই একইভাবে বাঁচতে হবে কেন? যাই হোক, সবার চাপে বল, ফ্যাশনে বল, কিংবা নিজের ইচ্ছাতেই বল, ইন্টারে ওঠার আগেই ম্যাথসকে ভাল লাগিয়ে ফেললাম।

পড়ার বইয়ের বাইরের বইটই পড়ার অভ্যেস আগে থেকেই ছিল। ইন্টারে ওঠার পর যখন এটা অনুভব করতে পারছিলাম, আমার সাহিত্য পড়তে ভাল লাগে, ‘ভাল লাগে’ মানে, আসলেই ভাল লাগে, আমি ভাল লাগাইনি, তখন ভাবলাম, সবাই যেভাবে করে সায়েন্স ফিকশন পড়ে এবং ‘ভাল লাগায়’, আমারও তো সায়েন্সের স্টুডেন্ট হিসেবে ওরকম কিছু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ভাললাগানো উচিত, কিংবা কিছু বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ। আমি এর আগে সায়েন্স ফিকশন অতো পড়িনি, বেছে বেছে শুধু ননসায়েন্স ক্লাসিক টেক্সটগুলি পড়তাম। শুরু করলাম পড়া। জোর করে হলেও ভাললাগাতে চাইলাম। কিন্তু দেখলাম, আমার মাথায় যতটা না সায়েন্সের কল্পনা খেলা করে, তার চাইতে বেশি খেলা করে ননসায়েন্সের কল্পনা। Science was a wrong journey for me. কারোর সাথে শেয়ার করলাম না। এর কয়েক বছর আগে এটা নিয়ে একটা বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল। যখন সিক্স কী সেভেনে পড়ি, তখন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতালিখতাম। দুটো কবিতার খাতাও ছিল আমার।

একদিন মায়ের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর মা অনেক বুঝিয়েশুনিয়ে এই বলে আমার ব্রেইনওয়াশ করে দিলেন যে, পড়াশোনা করার সময়ে কবিতা লেখা খারাপ। সেই কথা মনে করে আমার কল্পনার রাজ্য আমার মধ্যেই লুকিয়ে রাখলাম। জীবনে এই কল্পনার গুরুত্ব অসীম। ভালকিছু পেতে চাইলে কল্পনা করা প্র্যাকটিস করতে হয়।ইন্টারে পড়ার সময়ে সাহিত্য আর ভাষার গাঁথুনির প্রতি বিশেষভাবে দুর্বল হয়ে পড়লাম। সারাদিনই সাহিত্য নিয়ে পড়ে থাকতাম। আমাদের সময়ে সৃজনশীল পদ্ধতি ছিল না, আমাদেরকে ইংরেজি আর বাংলা গদ্যপদ্য পড়তে হত, বড় বড় প্রশ্নের উত্তর লিখতে হত। আমি নিজেই এটা অনুভব করতে পারতাম, অন্যরা যেখানে একটা ছোটগল্প পড়তেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সেখানে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা টানা পড়ে একটা উপন্যাস শেষ করে ফেলতে পারি। ইংরেজি আর বাংলা বইয়ের সিলেবাসের আর সিলেবাসের বাইরের সব টেক্সটই পড়ে ফেললাম। একটা ইংরেজি কবিতা পড়ার সময় অন্যদের যেসময়ে ডিকশনারি দেখতে দেখতেই সময় চলে যায়,

আমি ওইসময়ে ভেবে ফেলতে পারি, আসলে এখানে লেখক কোন কথাটি বোঝাতে চেয়েছেন, যা তিনি লেখেননি (Parallel meaning)। সারাদিন ইংরেজি আর বাংলা নিয়ে থাকতে থাকতে শব্দের খেলাকে ভালবেসে ফেললাম। আমি জানতাম না যে ডিকশনারি মুখস্থ করা সম্ভব নয়, তাই একদিন বোকার মতন সিদ্ধান্তনিলাম, ডিকশনারি মুখস্থ করে ফেলব। বঙ্গীয় শব্দকোষ, সাহিত্য সংসদের ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি, যথাশব্দ, আর চেম্বার্স ডিকশনারি অব সিনোনিমস্ অ্যান্ড অ্যান্টোনিমস্ মুখস্থ করা শুরু করে দিলাম।ডিকশনারি পড়ে পড়ে শেষের বইটিতে যে শব্দটি দেখতাম, নেই, সেটি পেন্সিল দিয়ে লিখে অ্যাড করে দিতাম। চলন্তিকা, সাহিত্য সংসদ আর বাংলা একাডেমীর বাংলা আর ইংরেজি ডিকশনারি, পেঙ্গুইনের বিভিন্ন ধরণের ডিকশনারি সহ কয়েকশ ভাষাসংক্রান্ত বইপত্র কিনে ফেললাম। এসব কিন্তু কাউকেই বলতাম না। ইন্টারে পড়ুয়া একটা ছেলে ওর স্বপ্ন নিয়ে হাসাহাসি সহ্য করতে পারে না। এভাবে করে আমার এক্সগার্লফ্রেন্ড ম্যাথস ছ্যাঁকা খেল নিউ গার্লফ্রেন্ড লিটারেচারের কাছে।বাংলা কিংবা ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করছে, এরকম কিছু ভাইয়া আর আপুর কাছ থেকে জেনে নিতে আরম্ভ করলাম, ওদেরকে ভার্সিটিতে কী কী পড়তে হয়।

উনারা শুরুতে আমাকে পাত্তা দিতে চাইতেন না, কিন্তু আমি এটা নিয়ে কনফিডেন্ট ছিলাম যে, ভাষা নিয়ে আমার জানাশোনা আমাকে অবজ্ঞা করার মতো নয়। আস্তে আস্তে অনার্সের সাহিত্যের বইপত্র পড়তে শুরু করে দিলাম। চট্টগ্রামের পাবলিক লাইব্রেরিতে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতাম। (ক্লাস ফাঁকি দেয়ার কারণে ইন্টারে ডিসকলেজিয়েট হয়েছিলাম।) এসব কেউ জানত না। জানলে হয়তো আমাকে বুঝিয়ে বলতো, ওই পাগলামিটা কেন নিরর্থক। আর আমিও হয়তোবা আমারপ্যাশন থেকে সরে আসতাম। যে মানুষ তার প্যাশন নিয়ে থাকতে পারে না, সে এমনকিছু করতে পারে না, যেটাকে আলাদা করে চোখে পড়ে।একজনের কথা এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে। আমার এক দাদা ইংরেজিতে অনার্স পড়তেন। উনার সাথে খুব গল্প করতাম। উনি আমাকে ডিকশনারি থেকে ইংরেজি শব্দ ধরতেন। (এই খেলাটা অবশ্য আমরা কয়েকজন কলেজফ্রেন্ড মিলেও খেলতাম।) উনার চাইতে গ্রামার আর ভোকাবুলারি বেশি পারতাম বলে উনি আমাকে একইসাথে ঈর্ষা এবং স্নেহ করতেন। মনে আছে, একদিন উনি খুব রাগ করে বলেছিলেন, “তোমার সমস্যাটা কী, বাপ্পি?

তোমাকে ফাউলারের ‘মডার্ন ইংলিশ ইউসেজ’ পড়ার বুদ্ধি কে দিয়েছে?” আমি উত্তর দিয়েছিলাম, “কেন দাদা, পড়লে কী হয়?” “রেজাল্ট খারাপ হবে, বাসায় বকবে।” “ওটা এখনও হচ্ছে না বলেই তো আমাকে বাসায় কিছু বলে না।” উনি আর কিছুই বলেননি সেদিন। আর কিছু বললে হয়তো আমি আর কোনদিনও উনার কাছে যেতাম না। সেসময় আমার কাছে মনে হত, ডক্টর এস সেন কিংবা রামজি লাল উনারা অনেক পণ্ডিত মানুষ। এই দুইজনের গাইডবই ইংরেজি অনার্সের ক্লাসে পড়ানো হত। সরাসরি অরিজিনাল টেক্সট পড়ার মতো বিদ্যে মাথায় ছিল না বলে আমিউনাদের লেখা গাইড বইয়ের মাধ্যমে বেশকিছু ক্লাসিক টেক্সট পড়ে ফেলেছিলাম। আমি কিন্তু ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি-ম্যাথসেরও অনেক ওয়ার্ল্ডফেমাস বই কিনেছিলাম। (এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, মাক্স বর্নের অ্যাটমিক ফিজিক্স, গ্লাস্টনের ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি, আই এল ফাইনারের অর্গানিক কেমিস্ট্রি, জি এইচহারডির অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য থিওরি অব নাম্বারস সহ আরও অন্তত একশো প্রামাণ্য বই। এমনকি ইকোনমিক্সেরও ১০-১২টি প্রামাণ্য বই কিনেছিলাম। কেন কিনেছিলাম? না কেনার অস্বস্তি থেকে বাঁচার জন্য।)

কিন্তু দেখলাম আমার ভেতরের আমি’র সবচাইতে ভালবাসার সাবজেক্ট হল লিটারেচার। যেকোনো টপিক নিয়ে ননস্টপ কঠিন কঠিন শব্দ আর ভাষার গাঁথুনি দিয়ে লিখতে পারতাম। কঠিন শব্দে বেশি মার্কস আসে, এটাই ছিল সময়ের অলিখিত নিয়ম। সেসময় রাত ১টার আগ পর্যন্ত ‘অকাজের পড়া’ পড়তাম আর এরপর শুরু করতাম ‘কাজের পড়া’। কখনও রেজাল্ট খারাপ হয়নি বলে বাসায় এটা নিয়ে বকত না। মায়ের কাছ থেকে বইকেনার জন্য টাকা চেয়েছি, কিন্তু পাইনি, এরকমটা কখনওই হয়নি।সেই বোকা আমি এই স্বপ্নে বিভোর ছিলাম যে ইন্টারের পর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়েপড়াশোনা করতে যাব। বেছে বেছে দিল্লি কেন? কারণ সেখানে গেলে এস সেন আর রামজি লালের সাথে দেখা হবে, উনারা তো ওই বিশ্ববিদ্যালয়েইপড়ান, উনাদের ক্লাস করতে পারব। খুব ছেলেমানুষি ভাবনা, না?

এক নির্বোধ কিশোরের একেবারে একরৈখিক ভাবনা। নির্বোধ কেন? যে ছেলে ইন্টারে সায়েন্সে পড়ে অনার্সে সাহিত্যে পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখার ‘অপরাধ’ করে, সে নির্বোধ নয় তো কী? টেস্ট পরীক্ষার পর মারাত্মক টাইফয়েডে আক্রান্ত হলাম। খুব অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কারণে টেস্টের পরের ৩-৪ মাস ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারলাম না, অনেক পড়াই ভুলে গেলাম। সবাই বুদ্ধি দিল, “এবার পরীক্ষা দিলে তুমি স্ট্যান্ড করতে পারবে না, পরেরবার পরীক্ষা দাও।” আমাদের সময়ে ‘বোর্ডস্ট্যান্ড’ বলে একটা দারুণ স্বপ্নের ব্যাপার ছিল, কোন একটা শিক্ষাবোর্ডে প্রত্যেক গ্রুপের মেধাতালিকার প্রথম ২০ জনকে ‘স্ট্যান্ড করেছে’ ধরা হত। শুধু আমার মা বলেছিল, “পরীক্ষা দিয়ে দে। তুই যেভাবে পারিস, লিখে দিয়ে আসিস। রেজাল্ট যা হয়, হোক।”কখনও কখনও এমনকি পুরো পৃথিবীর বাইরে গিয়ে মায়ের কথা শুনলে সেটার শেষটা ভাল হয়। পরীক্ষা দিয়ে দিলাম। স্টার মার্কস পেয়েছিলাম।
.
Sushanta Paul
1st, 30th BCS