Sunday , April 21 2019

বেত দিয়ে অধ্যক্ষকে কেন পিটিয়েছিলেন নুসরাতের মা ?

মাদ্রাসা অধ্যক্ষের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সোনাগাজীর নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তার জানিয়েছেন তিনি ওই অধ্যক্ষকে বেত দিয়ে পিটিয়েছিলেন। সোনাগাজী উপজেলার উপজেলার চর চান্দিয়া গ্রামের বাড়িতে বসে তিনি এ কথা বলেন।

শিরিন আক্তার জানান, তাকে নিয়েই ছিল নুসরাতের যত আহদ্মাদ। ছোটবেলা থেকেই মাকে ছাড়া তিনি ঘুমাতেন না। মাকে নিয়ে দেয়ালে অনেক কিছু লিখেছেন। সুন্দর সুন্দর বাণী লিখে রাখতেন। ছোটবেলা থেকেই বেশ সাহসী ছিলেন নুসরাত। ২৭ মার্চ শ্নীলতাহানির ঘটনার পরবর্তী অবস্থা বর্ণনা করে শিরিন আক্তার বলেন, ঘটনা শুনেই আমি মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম।

সেখানে গিয়ে দেখি অধ্যক্ষ হাত-পা ছেড়ে বসে আছেন। মেয়েকে শ্নীলতাহানির বিষয়ে প্রশ্ন করার পর তিনি আমাকে রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের ভয় দেখান। আমি ভীত না হয়ে সামনে পাওয়া একটি বেত দিয়ে অধ্যক্ষকে কয়েকবার বেত্রাঘাত করি।

তিনি বলেন, এ অবস্থা দেখে অনেকেই জড়ো হয়ে যান। সেখানে বসেই আমি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে ফোন দিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছি। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিষয়টি চেপে যেতে বলেন। তিনি বলেন, অনেক আগে থেকেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের অপকর্মের কথা শুনে এসেছি। আমরা আলিম পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নুসরাতকে অন্য মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেছি। তার আগেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নুসরাত চিরবিদায় নিল।

মেয়েকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন নুসরাতের মা। এ মামলায় গত ২৭ মার্চ গ্রেপ্তার হয় অধ্যক্ষ সিরাজ। ওই মামলা তুলে নিতে গত ৬ এপ্রিল নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় মারা যান। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকারীদের ক্রসফায়ারে দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ। শনিবার (১৩ এপ্রিল) পুরান ঢাকার করাতিটোলা স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।

ঢাকা-৬ আসনের এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ এসময় আরো বলে, ‘আইনের ভয় দেখিয়ে এদের নিবৃত্ত করা যাবে না। এদের একমাত্র শাস্তি হচ্ছে ক্রসফায়ার। যারা শিশু হত্যা, নারী ধর্ষণ, চলন্ত বাসে গণধর্ষণ করছে বুটেলের মাধ্যমে তাদের বিচার করতে হবে।’

একটি সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে এমপি ফিরোজ রশীদকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আইনে ক্রসফায়ার না থাকলেও, রাতের বেলায় অস্ত্র উদ্ধারে নিয়ে গিয়ে তো একটা করা যায়। ওইটাই করা দরকার। টাঙ্গাইলে বাসে রুপা হত্যার দুই বছর হলেও এখনো বিচার হয়নি। তখন ক্রসফায়ার দিয়ে দিলে রুপার পরিবারকে এত ঘুরতে হতো না।’

তবে অনেকেই একজন আইনপ্রণেতা হয়েও আইনের এই বক্তব্যকে অসমর্থনযোগ্য মনে করছেন।

-সময় নিউজ।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ এমপি ফেনীর নুসরাত হত্যাকান্ডের বিচার দাবি করে বলেন, আইনের ভয় দেখিয়ে এদের নিভৃত করা যাবে না। এদের একমাত্র শাস্তি হচ্ছে ক্রসফায়ার।

যারা শিশু হত্যা, নারী ধর্ষণ, চলন্ত বাসে গণধর্ষণ করছে বুটেলের মাধ্যমে তাদের বিচার করতে হবে।যেসকল মানবাধিকার কর্মী ক্রসফায়ারের বিরোধীতা করেন, তাদেরকে প্রশ্ন করতে চাই- আপনি নিজে ধর্ষিতা হলে কি বিচার চাইতেন? আইনের শাসনের ভয় দেখিয়ে নরপশুদের শায়েস্তা করা যাবে না।

তিনি বলেন, কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে যেনো এ ধরনের হিংস্র আসামীরা পার না পেয়ে যায় সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। শনিবার দুপুরে করাতিটোলা স্কুল এন্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাংহঠনিক সম্পাদক হেদায়াতুল ইসলাম স্বপনের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা আশিকুর রহমান লাভলু, ওয়ারী জোনের ডিসি ফরিদ উদ্দিন, গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল জলিল প্রমুখ।

ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় অভিযুক্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার মুক্তি দাবিতে আন্দোলন করা এবং হত্যা মামলার আসামি নূর উদ্দিনকে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

শুক্রবার (১২ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে ভালুকার সিডস্টোর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ময়মনসিংহ পিবিআই।এদিন ছদ্মবেশে নূর উদ্দিনকে গ্রেফতার করেন বাংলাদেশ পুলিশের চৌকস অফিসার মেহেদী হাসান।জানা গেছে, নূর উদ্দিন ভালুকায় অবস্থান করছেন এরকম গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে সে এলাকায় যান মেহেদী হাসানসহ পিবিআইয়ের কয়েকজন সদস্য। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে।

নূর হোসেনকে ছদ্মবেশে গ্রেফতারের একটি ছবি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা হচ্ছে।এদিকে নুসরাত জাহান রাফিকে পরিকল্পনা করে আগুন দিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছে আসামি নূর উদ্দিন।পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দেয়া স্বীকারোক্তিতে সে জানিয়েছে, আলেম সমাজকে অপদস্থ করার শাস্তি হিসেবে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয় প্রধান আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নূর উদ্দিনসহ অন্যরা।

গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে পরিক্ষা দিতে যায় নুসরাত। এরপর সেসময় তাকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার পর নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। আর সেখানে ৫দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত বুধবার রাতে মারা যান নুসরাত।

নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার আগের দিন ৫ এপ্রিল কারাগারে থাকা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে দেখা করেন তার ঘনিষ্ঠজন নুর উদ্দিনসহ পাঁচজন। সেখানেই সিরাজ নির্দেশনা দেন নুসরাতকে পুড়িয়ে মেরে ফেলার জন্য। তার কথা মতই তার বাকি সহযোগীরা নুসরাতকে সেদিন ডেকে নিয়ে গিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

শনিবার (১৩ এপ্রিল) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানায় মামলার তদন্তে থাকা সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর উপ-মহাপরিদর্শক বনজ কুমার মজুমদার নুসরাতকে হত্যা বিষয়ে কথা বলেন।তিনি বলেন, নুসরাতকে আগুন দেওয়ার ঘটনায় উপস্থিত ছিল ছয় জন। পুরো ঘটনার সঙ্গে ১৩ জন জড়িত ছিল। এ পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নূর উদ্দিন জানায়, সিরাজের সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে যান নূর উদ্দিন ও শাহাদাত। সেখানে তাদের নুসরাতকে শায়েস্তা করার নির্দেশ দেন সিরাজ। নির্দেশ অনুযায়ী শাহাদাত হোসেন শামীম নুসরাতকে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন।জিজ্ঞাসাবাদে নূর উদ্দিন জানায়, আলেম সমাজকে অপদস্থ করার ‘শাস্তি’ হিসেবে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয় প্রধান আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নূর উদ্দিনসহ অন্যরা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই ছাত্রীর মাধ্যমে তিনটি বোরকা ও কেরোসিন তেল আনা হয়। ৬ এপ্রিল বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে বলে শম্পা ওরফে চম্পা নামে এক ছাত্রীর দেয়া সংবাদে ভবনের চার তলায় যান নুসরাত। সেখানে আগে থেকে লুকিয়ে ছিলেন শাহাদাতসহ চারজন। তারা সেখানে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। রাফি অস্বীকৃতি জানালে প্রথমে ওড়না দিয়ে বেঁধে আগুন দিয়ে তারা নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যায়।

নূর উদ্দিন জানায়, এলাকায় সিরাজ উদ দৌলা বাহিনী অনেক প্রভাবশালী হওয়ায় পুড়িয়ে মারার ঘটনা সামাল দিতে পারবে এমন বিশ্বাস ছিল তাদের।পিবিআই জানিয়েছে, আগুন দেয়ার সময় বোরকা পরা চারজনের মধ্যে দু’জন পুরুষ ছিল। তবে ঘটনা চাপা দিতে গভর্নিং বডির কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা ছিল কিনা তা স্পষ্ট করে জানাননি তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এঘটনায় অন্তত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পিবিআই। নূরের দেয়া তথ্য থেকে এদের ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

নুসরাত হত্যার আসামিরা হলেন, প্রধান আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এ এস এম সিরাজ উদ দৌলা, ইংরেজি প্রভাষক আবছার উদ্দিন, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম মাকসুদ, ছাত্র শাহদাৎ হোসেন শামীম, সাবেক ছাত্র নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহমেদ, হাফেজ আব্দুল কাদের