Tuesday , May 21 2019

এইমাত্র পাওয়াঃ ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ফেনী, রুপ নিচ্ছে ‘হ্যারিকেনে’

ভারত মহাসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় ফনি ভয়াবহ হ্যারিকেনের আকার ধারণ করতে চলেছে। চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে এটি পূর্ব ভারতের কিছু অংশ এবং বাংলাদেশের ওপর আছড়ে পড়তে পারে এটি।

এখন ‘ফনি’ বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলীয় অংশে অবস্থান করছে। ক্রমেই ঝড়টির গতিবেগও বাড়ছে। এখন এর গতি ঘন্টায় ৩৯ মাইল থেকে সর্বোচ্চ ৭৩ মাইল পর্যন্ত রয়েছে। এর গতি একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের মতোই। ফলে চলতি সপ্তাহের শেষদিকে ঘুর্ণিঝড়টি ভয়াবহ হ্যারিকেনের আকার ধারন করতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ টাইফুন সতর্কতা কেন্দ্র পূর্বাভাস দিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ফনি একটি বড়সড় হ্যারিকেনের আকার ধারন করার মতো বাতাসও রয়েছে। বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় ফনি ক্যাটেগরি ৩ বা আরো শক্তিশালী একটি হ্যারিকেনের আকার ধারন করতে পারে।

আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় ফনি উত্তর-পশ্চিমদিকে এগিয়ে যাবে। এটি সপ্তাহের শেষে আরো উত্তরে মোড় নিয়ে পরে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে যেতে পারে। ফনি যদি এর সম্ভাব্য গতিপথের আরো বাম দিকে মোড় নেয় তাহলে পূর্ব ভারতের কিছু অংশে ভারি বৃষ্টি এবং বন্যা হতে পারে।

যদি ফণীর সম্ভাব্য গতিপথের ডানদিকে মোড় নিয়ে আরেকটু পূর্বদিকে এগিয়ে যায় তাহলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত এলাকায় আঘাত হানবে। কিন্তু বাংলাদেশের ওপর বেশি প্রভাব পড়বে। তবে যা ঘটার তা চলতি সপ্তাহের শেষদিকেই ঘটবে।

টানা দহনে অতিষ্ঠ বঙ্গবাসী। প্রার্থনা, কেবল কয়েক পশলা বৃষ্টির। ভারতের ওডিশা, কেরালায় ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র আশঙ্কা। জারি হয়েছে চূড়ান্ত সতর্কতাও। ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র প্রভাবে দুর্যোগের মধ্যে পড়তে পারে বাংলা।

আগামী ৩ মে দুই ২৪ পরগনা, দুই মেদিনীপুরে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। এর সঙ্গে ঝোড়ো বাতাসের দাপট বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা হাওয়া অফিসের।

প্রাথমিক ভাবে ওড়িশায় মাটি ছুঁয়ে বাংলাতেও আছড়ে পড়তে চলেছে ঘূর্ণিঝড় ফণী। ৪ মে বিকেলে দিঘার কাছে। তখন বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি থাকতে পারে। যা ঘূর্ণিঝড় আয়লার চেয়ে অনেকটা বেশি। ২৫ মে, ২০০৯-এ রেকর্ড হয়েছিল ঘণ্টায় ১১২ কিলোমিটার বেগে ঝড়। দিঘা থেকে কলকাতা-দক্ষিণ ২৪ পরগনা আসার পথে হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটারের আশপাশে থাকতে পারে। আপাতত হুগলি বন্দরকে সতর্ক করা হয়েছে। গভীর সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে বাংলার মৎস্যজীবীদের। যারা আছে, তাদের ১ তারিখের মধ্যে ফিরে আসতে বলা হয়েছে।

আগামী ৩, ৪, ৫ মে রাজ্যের উপকূল ও লাগোয়া জেলায় বিক্ষিপ্ত ভাবে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ২ মে থেকেই উপকূলে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আবহাওয়া দফতর।

বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় তৈরি নিম্নচাপ ঘূর্ণাবর্তের কারণে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। ক্রমশ শক্তি বাড়িয়ে ‘ফেনি’ নামের এ ঝড় উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এর ফলে এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গাঙ্গেয় এলাকায় আছড়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দপ্তর। ঘূর্ণিঝড় ফেনির প্রভাবে ২৮ এপ্রিল নাগাদ দক্ষিণ ভারতে ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু একই সময় বঙ্গোপসাগরের অন্যদিকে প্রচণ্ড গরম পড়বে। যদিও ২৫ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত ফেনির প্রভাব থাকবে।

মিয়ানমার থেকে তামিলনাড়ু উপকূল পর্যন্ত ঝড়ের কম-বেশি প্রভাব পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা এ ঝড়ের অনুঘটক হিসাবে কাজ করছে। এর ফলে শক্তিশালী রূপ নিয়ে ফেনি ১০০ কিলোমিটার গতিবেগে আছড়ে পড়তে পারে। এর সর্বোচ্চ গতিবেগ হতে পারে ১১৫ কিলোমিটার।

এদিকে বাংলাদেশের মতো ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও প্রচণ্ড গরম পড়ছে। এরইমধ্যেই ঘূর্ণিঝড় ফেনির বিষয়ে সতর্কতা এলো। তবে এর ফলে গরম কমছে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুক্রবার দেশটির আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোয় তীব্র গরম পড়বে। এ সব এলাকায় দিনের তাপমাত্রা দুই থেকে চার ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর মধ্যে কলকাতায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রিতে পৌঁছতে পারে।

বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে গরম থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে দুই থেকে তিন ডিগ্রি তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। স্থানভেদে কোথাও সাত ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তি উষ্ণতা, বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য যুক্ত হয়েছে। এ ভয়াবহ গরম থেকে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে ইতিমধ্যে সুস্পষ্ট লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে; যা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ইতিমধ্যে ঝড়টির নাম দেয়া হয়েছে ‘ফেনি’।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়া বিভাগের (বিএমডি) কর্মকর্তারা চানিয়েছেন, প্রচণ্ড শক্তি সঞ্চয় করে ‘ফেনি’ ৪-৫ মে বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে গরম একটু বেশিই থাকে। বিশেষ করে এপ্রিলে কম বৃষ্টি, বেশি গরম আর মে মাসে বৃষ্টি ও গরম দুটিই থাকে। কিন্তু এবার উল্টো। কয়েক দিন ধরে যে তাপমাত্রা লক্ষ্য করা গেছে, তা মোটেও স্বাভাবিক নয়।

এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একটা ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি এল নিনো মডোকির প্রভাবও আছে। তবে আশার খবর হল- বঙ্গোপসাগরে শ্রীলঙ্কার দিকে একটি সুস্পষ্ট লঘুচাপের রেখা দেখা যাচ্ছে। এটি পরিণতি পেলে হয়ত গরম কমবে। তবে আতঙ্কের দিক হল- এটি ১১৫-১২০ কিলোমিটার বেগে বাতাসসহ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এর গতিপথ এত আগে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়।

কিন্তু এন্টি ক্লকওয়াইজ (ঘড়ির বিপরীত দিক) পদ্ধতির হিসাবে এর গতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের আরাকান মনে হচ্ছে। যদিও ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) বলছে, ভারতের দক্ষিণের তামিলনাড়ু থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলে কম-বেশি এর প্রভাব পড়বে। আগামী ৪-৫ মে নাগাদ এটি উপকূল অতিক্রম করতে পারে। তার আগে পর্যন্ত এ গরম অব্যাহত থাকতে পারে।

অধ্যাপক ইসলাম আরও বলেন, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিছুদিন ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হচ্ছে।
সেখানকার গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে দশমিক ৫ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এল নিনো মডোকি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনটি হলে সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম উপকূলে খরা বা কম বৃষ্টিপাত হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশে এবার মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হতে পারে।

২১ এপ্রিল সর্বশেষ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর দিকে বৃষ্টিপাত হয়েছে। ওই দিন ঢাকায়ও সামান্য বৃষ্টি হয়। এরপর আর বৃষ্টির দেখা নেই। এপ্রিলে সাধারণত দিনের চেয়ে রাতের ব্যাপ্তিকাল কম। এ কারণে সূর্যের অনুপস্থিতিতে পৃথিবীকে শীতল করার পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে না প্রকৃতি। বায়ুমণ্ডল শীতল না হতেই গরম নিয়ে আসছে নতুন দিনের সূর্য।

সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। গরমে রাতেও ঘুমাতে পারছে না মানুষ। দাবদাহে স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমছে। তীব্র গরমে কোথাও স্কুল-কলেজে কম ক্লাস নিয়ে আগেই ছুটি দেয়া হচ্ছে। অসহ্য গরমে প্রায় সবারই হাঁসফাঁস অবস্থা।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, প্রায় সারা দেশেই তাপপ্রবাহ বয়ে গেলেও ঢাকায় অনুভূতিটা বেশি। এর কারণ ৮টি। এগুলো হল- দিনের ব্যাপ্তিকাল রাতের তুলনায় বড়। রাত তাপ বিকিরণ করে পৃথিবী ঠাণ্ডা করতে পারে না; সর্বোচ্চ ও সর্বনিু তাপমাত্রার পার্থক্য কম; বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য; জলীয় বাষ্প শুষ্ক বাতাস ছেড়ে দেয়ায় বাতাস আরও উত্তপ্ত হয়; অতিমাত্রায় এসির ব্যবহার; গাড়ির কার্বন বা কালো ধোঁয়া; ঢাকার আশপাশের ইটভাটার কার্বন; ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের নিঃসরিত দূষিত পদার্থ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাপমাত্রার সর্বোচ্চ অবস্থাটি সাধারণত বিকিরণের মাধ্যমে হ্রাস পায় রাতে। কিন্তু এপ্রিলের ছোট রাত সেটি পারছে না। আবহাওয়া বিভাগের বৃহস্পতিবার সকালের বিজ্ঞপ্তিও তাই বলছে।

এতে দেখা যায়, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সর্বনিম্ন ছিল ২৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অপরদিকে দিনের বেলায় ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর সর্বনিম্ন ২৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ দিনে-রাতে সমান উত্তাপ বিরাজ করছে। এসব মিলে জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠছে।

সাধারণত ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা থাকলে সেটিকে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলে সেটিকে মাঝারি এবং ৪০ ডিগ্রির বেশি হলে সেটিকে তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়।