Monday , May 20 2019

সেই ডাঃ মৌমিতা ও তুষারকে এবার একহাত নিলেন মাশরাফির ভাই নিজেই

গেল শনিবার এক ঝটিকা সফরে নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালে হাজির হন মাশরাফি বিন মুর্তজা। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষদের কাছ থেকে নানা সমস্যার কথা শোনেন তিনি।

খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন ডাক্তার।

মাশরাফি আরও জানতে পারেন, ছুটি ছাড়াই একজন চিকিৎসক তিন দিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন! ক্ষিপ্ত হয়ে রোগী সেজে ওই চিকিৎসককে ফোন করেন মাশরাফি নিজেই। ওই চিকিৎসক রোগীকে অর্থাৎ মাশরাফিকে বলেন রবিবার হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিতে।

এ সময় নিজের পরিচয় দিয়ে সেই ডাক্তারকে তার কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দ্রুত কর্মস্থলে ফিরে আসার নির্দেশ দেন মাশরাফি। হাসপাতালে মাশরাফির ঝটিকা সফর ও চিকিৎসকের সঙ্গে ফোনালাপের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। অনেকে সাংসদ মাশরাফির এমন কাণ্ডে বাহবা দিলেও অনেকেই তার সমালোচনা করেন।

সমালোচকদের এই তালিকায় রয়েছেন ড. আব্দুন নূর তুষার এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুল জলিলের মেয়ে ডা. মৌমিতা জলিল জুঁই। সমালোচনার জবাবে অবশ্য এখন পর্যন্ত কোনো কথাই বলেননি মাশরাফি।

কিন্তু তার ছোট ভাই মোরসালিন বিন মুর্তজা চুপ করে থাকেননি। সমালোচকদের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন তিনি।

পাঠকদের জন্য মাশরাফির ভাইয়ের সেই ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো—

ডা: মৌমিতা, একজন বিসিএস (ক্যাডার)।

মাশরাফি বিন মোওর্জার শিক্ষাগত যোগ্যতা কিন্তু আপনার থেকে অনেক খানি কম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে ভর্তি হয়ে খেলাধুলার কারণে পড়ালেখা ভালো ভাবে করতে পারেন নাই।

কিন্তু তিনি সরকারি হাসপাতালের একজন কর্তব্য বিমুখ ডা: কে ফোন করে, স্যার বলে ডেকে তার কাছে ৩ দিন অনুপস্থিত থাকার কারন জানতে চেয়েছেন। যেটার অধিকার তার আছে। তিনি কথা বলা কালিন সব থেকে খারাপ ভাবে যে কথাটি বলেছেন সেটি হল “আপনি কি ফাজলামি করেন।”

অথচ আপনি একজন বিসিএস ক্যাডার হয়ে একজন সাংসদ সদস্য কে গালি দেন “কুত্তার বাচ্চা” বলে। এই হলো আপনার পড়ালেখা করার ফল।

জনাব, আবদুর নুর তুষার স্যার,

আপনি অনেক কথা লিখেছেন যেগুলি আমার মাথার ওপর দিয়ে গেছে। তবে এতটুক বুঝেছি আপনি ডাক্তারদের পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন। নিজ পেশার ভাইদের পক্ষ নেওয়া উচিত। তাই বলে আপনি অন্যায়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলবেন?

ম্যাচ হারার কারনে বাংলাদেশ টিমকে যখন অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়া হয় (এমনকি তাদের পরিবারকেও) তখন বাংলাদেশের সকল জেলার খেলোয়াড়রা যদি প্রতিবাদ করে! কেমন হবে?? করে না। গালিটাও মাথা নিচু করে মেনে নেয়। অন্যায়ের পক্ষ নিয়েন না।

মাশরাফি বিন মুর্তজা, ক্রিকেটার কাম সংসদ সদস্য। সবশেষ জাতীয় নির্বাচনে নড়াইল-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের ব্যানারে নির্বাচিত হন তিনি। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ম্যাশ।

সম্প্রতি নড়াইলের আধুনিক সদর হাসপাতালে ঝটিকা সফরে গিয়ে চার চিকিৎসককে অনুপস্থিত পান মাশরাফি।

পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। চারজনকেই সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে নড়াইল এক্সপ্রেসের অনুরোধে ওদের বহাল রাখা হয়েছে। তবু আলোচনা কেন?

সোশ্যাল মিডিয়ায় মাশরাফির সমালোচনায় মেতেছেন চিকিৎসক সমাজ। অনেকে তাকে নিয়ে ট্রোল করছেন। তবে বসে নেই ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক ভক্তরা। তারাও প্রিয় তারকার পক্ষ নিয়ে নিন্দুকদের ধুয়ে দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক এখন তুমুল পর্যায়ে। যা অনেকটা খিস্তিতে রূপ নিয়েছে।

চিকিৎসকদের দু-একজন মাশরাফির যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশ ওয়ানডে অধিনায়ক পারলে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে দেখান।

চলুন এবার ঘুরে আসি ঘটনার পটভূমি থেকে। গত শনিবার ওই হাসপাতালে যান মাশরাফি। সেখানে গিয়ে দেখেন বিনা ছুটিতে চার চিকিৎসক অনুপস্থিত। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে যান তিনি। এরপর রোগী সেজে এক চিকিৎসককে ফোন করেন। তিনি তাকে রোববার এসে চিকিৎসা নিতে বলেন। এরপর নিজের পরিচয় দিয়ে ওই চিকিৎসককে মাশরাফি বলেন,এখন যদি হাসপাতালে অপরারেশনের দরকার হয়, তাহলে সেই রোগী কী করবে? ফাজলামি করেন আপনি? জানেন আমি আপনাকে কী করতে পারি?

সেই চিকিৎসককে তার কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দ্রুত কর্মস্থলে ফিরে আসতে বলেন মাশরাফি। তার হাজিরা খাতাও দেখেন। সেখানে হাজিরা ছিল না। এমনকি বাকিদেরও ছিল না। তাদের ছুটির কোনো দরখাস্তও পাননি তিনি।

এরপর মাশরাফি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের কাছ থেকে নানা সমস্যার কথা জানতে পারেন। সর্বোপরি ওই সময় পুরো হাসপাতালে মাত্র একজন চিকিৎসককে পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

ওই ঘটনার পর সেই চারজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তারা হলেন সার্জারির সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. আখতার হোসেন ও ডা. মো. রবিউল আলম, মেডিকেল অফিসার ডা. এ এসএম সায়েম ও কার্ডিওলজির জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. শওকত আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে তাদের বহাল রাখা হয়।

এখন এসব নিয়েই চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সাংবাদিক শেরিফ আল সায়ার ডয়চে ভেলেকে বলেন, মাশরাফি একজন এমপি। সেই হিসেবে যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে আমার মনে হয়েছে, ভাষা বা শব্দ প্রয়োগে আরেকটু সতর্ক হতে পারতেন।

তিনি বলেন,মাশরাফি নড়াইল গভর্নমেন্ট হাসপাতালে যা দেখেছেন, তা বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতালের চিত্র। সেগুলোতে অধিকাংশ সময়ই চিকিৎসক থাকেন না। তারা ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট প্র্যাক্টিসে। এর একটা সুরাহা হওয়া দরকার।

জ্যেষ্ঠ এ সাংবাদিক বলেন, এতে মাশরাফির কোনো দোষ নেই। কোনো অন্যায় করেননি। হাসপাতালে গিয়ে কোনো ভুল করেননি। যারা তাকে আক্রমণ করছেন,তারা সবাই চিকিৎসক। আমরা অতীতেও এমনটা দেখেছি। কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কেউ অনিয়ম বা অবহেলার অভিযোগ তুললে চিকিৎসকরা জোট বেঁধে প্রতিবাদ করেন।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাধারণ সম্পাদক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে মাশরাফির হাসপাতাল পরিদর্শন এবং চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ঠিক আছে। তবে এর মাঝে কোনো কিন্তু আছে। বিষয়টা হলো ভাষা প্রয়োগ। নতুন এমপি তো, বোধহয় সেই কারণে বিষয়টা রপ্ত করতে পারেননি।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে চিকিৎসকের যা হওয়ার তাই হবে। সরকার ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমি আপনাকে কী করতে পারি। মাশরাফি তাকে এ কথা বলতে পারেন না। এটা প্রকারান্তরে হুমকি। এছাড়া ‘ফাজলামি’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। একজন মানি লোকের মুখে শব্দটা মানায় না। এটাও একধরনের ফাজলামি।

ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী এও বলেন, কোনো চিকিৎসক চাকরিবিধি ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাকে ডিউটিটা বুঝতে হবে।

গত জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেশের বিভিন্ন এলাকার ১০ হাসপাতালে অভিযান চালায়। ওই সময় ৬২ শতাংশ চিকিৎসককে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া ও পাবনায় সরকারি হাসপাতালে এ দৃশ্য দেখা গেছে।

তিনি বলেন, আমরাও মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছি। দুদকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেয়া হলো। কোনো অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। আসলে চিকিৎসকরা রোস্টার ডিউটি করেন। ২৪ ঘণ্টা ডিউটি ভাগ করা থাকে। তাই সবাইকে একসময়ে হাসপাতালে পাওয়া যাবে না। কেউ সকালে, কেউ দুপরে, কেউ রাতে দায়িত্ব পালন করেন। এটা জানতে ও বুঝতে হবে।