জিন্নাহর কবরের নামফলকে বাংলা! এই ভাষা চর্চায় আগ্রহী পাকিস্তানি তরুণরা!

 বায়ান্নর রক্তঝরা ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে একাত্তরে ‘বাংলাদেশ’ নাম নিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণের মধ্যে পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব থাকলেও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা (কায়েদ-এ-আযম) মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ও জাতীয় নেতা (কায়েদ-এ-মিল্লাত) লিয়াকত আলী খানের কবরের নামফলকে আছে বাংলায় খোদাই করা নাম। তার চেয়েও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণদেরদের মধ্যে অনেকেই বাংলা চর্চায় আগ্রহী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেদেশের তরুণদের সঙ্গে  আলাপচারিতায় এ তথ্য জানা যায়।

ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু-মুসলিমের ধারাবাহিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় মুসলিমপ্রধান বহুজাতিক রাষ্ট্র পাকিস্তান। কিন্তু রক্তঝরা আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেয়ে ২৪ বছরের মাথায় ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ভাষারাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১২০০ মাইল দূরে (মাঝখানে ভারতের ভূখণ্ড) অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ। এই স্বাধিকার আন্দোলনের শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে; উর্দুকে অখণ্ড পাকিস্তানের ‘একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার পর উর্দুর পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্টের মাতৃভাষা বাংলাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করার দাবিতে। ১৯৫২ সালে ভাষার মিছিলে চালানো গুলিতে বাঙালি ছাত্ররা শহীদ হওয়ার কারণেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল বাঙালির মধ্যে। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা বিষয়ে মতবিরোধ থাকলে সকল মতের মানুষই ঐক্যবদ্ধভাবে ৫২’র শহীদদের স্মরণ করে থাকেন যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে।

Untitled

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতীয় বাংলা (সাবেক পশ্চিমবঙ্গ) রাজ্য, লন্ডনের বাংলা টাউন কিংবা সিয়েরা লিওনে চর্চিত ভাষা বাংলা। তবে ভাষার জন্য রক্তঝরা আন্দোলন কেবল এই বাংলার মাটিতেই হয়েছিল। ৫২’র ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশিরা ‘জাতীয় শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করে এলেও ইউনেস্কোর বদৌলতে ১৯৯৯ সাল থেকে সারা বিশ্বে দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। আর সেই সূত্রে দিনটি পালিত হয় পাকিস্তানেও। একুশের প্রথম প্রহরে মাহরুখ শাহ নামের এক পাকিস্তানি তরুণী ফেসবুকে Soul Sisters Pakistan নামের একটি গ্রুপে  ইংরেজিতে লেখেন, I want to learn Bangla. Who among you can help me? কমেন্টের সূত্র ধরে জানা যায়, শুধু তিনি নন, অনেক তরুণীই বাংলা শিখতে আগ্রহী। পরে এদের বিভিন্নজনের সঙ্গে মেসেঞ্জারে আলাপ করে জানা যায়, শুধু তারা নন, দেশটিতে অনেক তরুণীই বাংলা শিখতে আগ্রহী। মাহরুখ শাহ জানান, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরকে ভালোলাগে। তাই বাংলা শিখতে চান তিনি।

সাইয়্যেদা ফিযযা নামের এক ইঞ্জিনিয়ার তরুণী জানান, “পাকিস্তানে একাত্তরের আটকেপড়া বাঙালিরা আমাদের সাথে মিশে গেছে। অনেকের বাবা-দাদা বাংলা চর্চা করেন। বাংলাদেশের আলমগীর পাকিস্তানের সুপরিচিত শিল্পী, যিনি অনেক বাংলা গানও করেন। পাকিস্তানের শিল্পী ফারহান আলী ওয়ারিসের একটি বাংলা নওহা (আশুরার শোকগীতি) খুব জনপ্রিয়। আমাদের দেশে সাবেক ক্রিকেটার ও রাজনীতিবিদ ইমরান খান একসময় বাংলাদেশের বিজ্ঞাপণে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জয়ে আমরা আনন্দিত হই। তাছাড়া কায়েদ-এ-আযম এবং কায়েদ-এ-মিল্লাতের কবরের নামফলকেও বাংলায় নাম লেখা আছে।”

কিন্তু মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খান বাঙালির ওপর উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন -এমন অভিযোগের উত্তরে তিনি বলেন, “কায়েদ-এ-আযমের (জিন্নাহ) মাতৃভাষা উর্দু ছিল না। গুজরাটি ছিল। পাকিস্তানিরা সবাই উর্দুভাষী নয়, আমিও নই। কিন্তু উর্দু আমাদের কমন ল্যাঙ্গুয়েজ। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় ইংরেজির পর কমন এলিট ল্যাংগুয়েজ ছিল দুটি- হিন্দি আর উর্দু। ভারতভাগের পর গান্ধিজি হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করেন, তাই জিন্নাহ পাকিস্তানের জন্য উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি তো ১৯৫২ এর আগেই মারা যান। সামরিক সরকার আলোচনা-সমঝোতা করলে ২১ ফেব্রুয়ারির অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো যেত। তারা ভারতের চক্রান্ত খুঁজতে গিয়ে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে। যার খেসারত দিতে হয়েছে ১৯৭১ সালে।”

এদিকে পাকিস্তানিদের বাংলা চর্চার সত্যতা মিললো ফেসবুকে শারমিন ইস্পাহানী নামের এক তরুণীর পোস্টে। পাকিস্তানের শিল্পী ফারহান আলী ওয়ারিসের একটি বাংলা নওহা’র (আশুরার শোকগীতি) ভিডিও তিনি পোস্ট করেছেন তার টাইমলাইনে। সেখানে বাংলায় গাইতে দেখা যায় এই শিল্পীকে। এর মাঝেই উর্দু ভাষায় একজনের কণ্ঠে বলা হয়, “…আমাদেরকে পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষাতেই হোসাইনিয়াতের বার্তা দেয়া উচিত।”