ইসলামের দৃষ্টিতে হস্তমৈথুন কি জায়েজ নাকি নাজায়েজ?

মানুষের যৌনজীবনে অত্যন্ত জরুরি আলোচ্য বিষয় হচ্ছে Musterbation বা হস্তমৈথুন, যার আরেক নাম স্বমোহন। আমাদের দেশের স্কুল-কলেজে ইসলামী যৌনশিক্ষা না পড়ানো এবং পরিবারে এ নিয়ে ভালোভাবে আলোচনা না হবার ফলে নানা রকম মনগড়া ধারণা নিয়ে বা শুনে গোপনে হস্তমৈথুন চর্চা শুরু করে কিশোর-কিশোরীরা। হস্তমৈথুন নিয়ে ইসলামের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন অবস্থান সম্পর্কে জানা এবং জানানো সকলের কর্তব্য।

মূলধারার ইয়াহুদি, ঈসায়ী এবং জরোথ্রুস্টীয়, বৌদ্ধ পণ্ডিতদের মতে, হস্তমৈথুন সমর্থনযোগ্য নয়। তবে গ্রিক, রোমান, মিশরীয় ও আরবীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে হস্ত‌মৈথু‌নের ব্যাপক চর্চা ছিল বলে বিভিন্ন রিসার্চে প্রমাণ মেলে। আবার ইহুদি ও ভারতীয় সনাতন পণ্ডিতদের একাংশও হস্তমৈথুনকে সমর্থন করেন। এদিকে, ইসলামী শরিয়তের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে কুরআন ও হাদিস। এ দুটিতে কোনও স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলেই কেবল মুজতাহিদদের ইজমা বা ঐকমত্যের বিষয়টি সামনে আসে। মুজতাহিদরা কোনও কল্যাণকর বিষয়কে হারাম বা মাকরূহ ঘোষণা করেন না, এমনকি সেটা জাহেলিয়াতের যুগের প্রথা হলেও। আবার কোনও অকল্যাণকর বিষয়কে হালাল বা জায়েজ ঘোষণাও করেন না তারা। তাই আমরা আগে হস্তমৈথুনের অকল্যাণকর দিকগুলো সম্পর্কে জানবো। কারণ ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে সবসময় ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।

হস্তমৈথুনকারীরা নিজেদের যৌন উত্তেজনায় উত্তেজিত করার জন্য অশ্লীল ছবি, সাহিত্য, পর্ন ভিডিও ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে, যা তাদের এবং ইসলামের মাঝে মারাত্বক দূরত্ব সৃষ্টি করে। হস্তমৈথুনে আসক্তদের মাথায় সারাদিন অশ্লীল বিষয়াদি ঘুরপাক খায়। এসব অশ্লীল চিন্তা তাদের অন্য আরও পাপাচারে লিপ্ত করে। বেশিরভাগ সময়ই হস্তমৈথুনকারীরা অপবিত্র থাকে। অপবিত্র থাকার দরুণ তারা নামায পড়তে পারে না। নামাজে মনযোগী হতে পারে না বলে তাদের নামায কবুলও হয় না। হস্তমৈথুনের প্রভা‌বে পুরো শরীর দুর্বল হয়ে যায়, ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যহা‌নি ঘ‌টে এবং শরীর রোগ–বালাইয়ের আখড়া হয়ে যায়। চোখের ব্যাপক ক্ষতিসা‌ধিত হয়। চো‌খ দি‌য়ে সব‌কিছু‌কে ঘোলা ও ঝাপসা দেখা যায়। হস্ত‌মৈথু‌নের ফ‌লে স্মরণশক্তি কমে যায়, সব‌কিছু‌তে অবসা‌দের ছায়া প‌ড়ে। মাথা ধরা, মাথা ঘোরা ইত্যাদি আরো অনেক সমস্যা হয়। সামান্য উত্তেজনায় যৌনাঙ্গ থেকে তরল পদার্থ বের হয়। এছাড়াও নার্ভাস সি‌স্টেম, হার্ট, ডাই‌জেস‌টিভ সি‌স্টেম, ইউ‌রিনা‌রি সি‌স্টেম এবং আরো অন্যান্য সি‌স্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ যেমন: হজম প্রক্রিয়া এবং প্রসাব প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করে। হস্তমৈথুনের ফ‌লে যে বীর্যপাত ঘ‌টে, তাতে কো‌টি কো‌টি শুক্রাণু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অতিরিক্ত করলে সন্তান জন্মদানে ব্যর্থতা দেখা দেয়। এই বদভ্যাসে আসক্ত পুরুষদের যৌনাঙ্গ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। হস্তমৈথুনের ফলে যৌনাঙ্গে কিছুটা বিকৃতি ঘটে, প্রসাবের রাস্তায় জ্বালা-পোড়া বেড়ে যায়। হস্তমৈথুনের ফলে অণ্ডকোষে বীর্যরস তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটে, অণ্ডথলিতে ব্যাথার সৃ‌ষ্টি হয়। পুরু‌ষদের অকাল বীর্যপাত বা দ্রুত বীর্যপাত শুরু হয়। স্বামীরা ধীরে ধীরে নপুংসক হয়ে যায়। হস্তমৈথুনে অভ্যস্ত নারী বা পুরুষ বিবাহ পরবর্তী যৌন জীবনে সুখী হতে পারে না। হস্তমৈথুন তাদের প্রকৃ‌তিপ্রদত্ত যৌনতা‌কে নষ্ট ক‌রে দেয়। বৈবাহিক সম্পর্ক টেকসই হয় না, দাম্পত্য কলহ থেকে সামাজিক নানা অশান্তির সৃষ্টি করে। হস্তমৈথুনে আসক্তরা মুসলমান হলেও তাদের ঈমান খুবই দুর্বল হয়। ইসলামী ইনকিলাব-ইন্তিফাদা তো দূরে থাক, সামান্যতম আমর বিল মারুফ (সৎ কাজের আদেশ) ও নাহি আনিল মুনকার (অসৎ কাজে বাধা দান) করতেও ভয় পায়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ব‌লেন, “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতেই তাদের জন্য পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে।” (২৪:৩০-৩১)

রাসূলুল্লাহ্ (দ) বলেন, “যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিস (জিহ্বা) এবং দুইপায়ের মধ্যবর্তী জিনিসের (যৌনাঙ্গ) নিশ্চয়তা (সঠিক ব্যবহারের) দেবে, আমি তার বেহেশতের নিশ্চয়তা দিবো। ” –(বুখারী, মিশকাত)

এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় , জিহ্বা ও যৌনাঙ্গ পা‌পের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। সুন্নি চার মাজহাব এবং শিয়া ফিকাহর সকল মুজতাহিদের এই মর্মে ইজমা রয়েছে যে, ইসলামে কেবল বৈবাহিক যৌন‌ক্রিয়া ও শারী‌রিক মিলন অনুমোদিত এবং বিবাহ ব‌হির্ভুত অবস্থায় যৌনা‌ঙ্গের হেফাজ‌তের নি‌র্দেশ র‌য়ে‌ছে।

তবে হস্তমৈথুন সরাসরি হারাম, নাকি মাকরূহ, তা নিয়ে ইসলামী মাজহাবগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইসলামের সকল মাজহাব (schools of thought) একমত যে, হস্তমৈথুনের পর গোসল করা ফরজ, অযু যথেষ্ট নয়। সুন্নি চার মাজহাবের মধ্য হানাফি ফিকাহে সাধারণভাবে হস্তমৈথুন হারাম, তবে যেনার ভয় থাকলে করা যাবে। হানবলী মাজহাব মতে, বৈধ যৌনসঙ্গীর অভাবে সমস্যায় ভুগছেন এমন নারী পুরুষ, মুসাফির ও বন্দিদের জন্য তা বৈধ। ইমাম হানবলের (রহ) মতে, এটা হচ্ছে প্রচণ্ড ক্ষুধায় খাবারের অভাবে শুকরের হারাম মাংস খেয়ে জান বাঁচানোর মতো। মালিকী ও শাফিয়ী ফিকাহে হস্তমৈথুন সকল সময়ের জন্য নিষিদ্ধ বলে গণ্য। শিয়া মাজহাবে হস্তমৈথুনকে বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের মতোই কবিরা গোনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে তারা কুরআনের যে আয়াতের ওপর ভিত্তি করেন তা হলো- “মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র; যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত, যারা যাকাত দান করে থাকে এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও ক্রিতদাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর কেউ এর বাইরে কামনা করলে তারা সীমালংঘনকারী হবে।” (২৩:১-৭)। এছাড়া শিয়া কিতাবগুলোয় আহলে বায়েতের ইমামদের (আ) রেওয়ায়েতে কিছু হাদিসে চোখ, মুখ, হাত, মস্তিষ্ক ও যৌনাঙ্গের যেনার কথা বলা হয়েছে। শিয়া আলেমদের দাবি, হাতের যেনা বলতে হস্তমৈথুনকেই বোঝানো হয়েছে।

হস্তমৈথুনের আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে কামভাব দমনে রাখা। এজন্য সর্বোপরি নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা আবশ্যক। বেগানা নারী বা অশ্লীল ছবি দেখলে দৃষ্টি নত রাখতে হবে। সর্বদা আল্লাহর জিকির ও ধর্মীয় সংস্কৃতির চর্চায় থাকতে হবে। যদি কোনও যুবক সেই পর্যায়ের মুত্তাকী না হন, তাহলে তার উচিত বিয়ে করা। যদি কোনও যুবক সাধারণ মুমিন হন, তার উচিত বিশুদ্ধ সিয়াম সাধনায় থেকে কামভাব দমন করা। রসূলুল্লাহর (দ) জামানায় যুবকদের লক্ষ্য করে একদিন তিনি বলেন, “হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে, তাদের বিবাহ করা উচিত। কেননা বিবাহ দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর যে বিবাহের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে না, তার উচিত (কামভাব দমনের জন্য) রোযা রাখা।” -(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত)

অনেকের সংসার চালাবার সামর্থ্য নেই বা বিয়ে করতে কোনও সমস্যা আছে বা বিদেশে স্ত্রী থেকে দূরে থাকেন। এ ধরনের ব্যক্তিরা যদি উচ্চ পর্যায়ের মুমিন না হয়ে সাধারণ মুসলিম হন এবং রোযা বা জিহাদুন নফসে ব্যর্থ হবার আশংকা থাকে, তাহলে বিকৃত যৌনাচার, পশুকামিতা, শিশুকামিতা, ধর্ষণ, ব্যভিচার, প্রেমের নামে শারীরিক সম্পর্ক ইত্যাদি কবিরা গোনাহ থেকে বাঁচার পথ হিসেবে ওই ব্যক্তির জন্য শিয়া ফিকাহে ‘মুতা’ বা অস্থায়ী বিবাহের অনুমতি রয়েছে। এক্ষেত্রে তারা কুরআনের যে আয়াতের ওপর ভিত্তি করেন, তা হচ্ছে-

“নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী তথা কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে অধিকার করা বন্দিনী ছাড়া সকল সধবা নারী তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ। তোমাদের জন্য এটি আল্লাহর বিধান। উল্লেখিত নারীরা ছাড়া অন্য নারীদের অর্থ ও মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করা তোমাদের জন্য বৈধ। এসব বিয়ের উদ্দেশ্য পবিত্রতা ও সম্ভ্রম রক্ষা অবৈধ যৌন সম্পর্ক নয়। আর যে সব নারীকে তোমরা অস্থায়ীভাবে বিয়ের পর সম্ভোগ করেছ, তাদেরকে নির্ধারিত মোহর দেয়া তোমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় কতর্ব্য। মোহর নির্ধারণের পর কোনও বিষয়ে পরস্পরে রাজী হলে তাতে তোমাদের কোনও দোষ নেই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং প্রজ্ঞাময়।” (৪ : ২৪)

যদিও বেশিরভাগ সুন্নি আলেমদের মত হচ্ছে, মুতা সম্পর্কিত এই আয়াতটি খাইবারের যুদ্ধের সময় রহিত হয়েছে। কিন্তু শিয়া আলেমদের মতে, খাইবারের যুদ্ধের সময় মুতা বিবাহে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ছিল মুসলমানদের মনযোগ শত্রুদের দিকে রাখার জন্য। কারণ আল্লাহর বিধানে কোনও পরিবর্তন হয় না। এক্ষেত্রে যে আয়াতের ওপর ভিত্তি করা হয়, তা হচ্ছে- “আপনি আল্লাহর বিধানে পরিবর্তন পাবেন না এবং আল্লাহর রীতি-নীতিতে কোন রকম বিচ্যুতিও পাবেন না। (৩৫ : ৪৩)। শিয়া কিতাব ‘নাহজুল বালাগা’-তে হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের (কা) একটি খুতবায় জানা যায়, তাঁর পূর্ববর্তী একজন খলিফার শাসনামলে মুতা রদ করা হয়, যা রাসুলাল্লাহর (দ) সময় প্রচলিত ছিল।

সুন্নি সমাজে ‘নিকাহ মুতা’ অস্বীকৃত হলেও মুতার মতো পরিস্থিতিতে অনেকে ‘নিকাহে মিসইয়ার’ ও ‘নিকাহে উর্ফি’ নামের অস্থায়ী বিয়ে অনুমোদন করেন। আর শিয়া ফিকাহে মুতা অনুমোদিত হলেও উৎসাহিত করা হয় না। যাহোক, সমস্ত আলোচনায় এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলাম ব্যক্তিক, পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি ও শৃংখলা রক্ষায় মানুষের যৌন সমস্যায় কল্যাণকর সমাধান দিয়েছে। আর শরীয়তে হস্তমৈথুন সাধারণভাবে নাজায়েজ একটি কাজ।